ঢাকা   শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Image Not Found!

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায় মতিয়া চৌধুরী-- মো: তৌহিদুল ইসলাম খোকন

Logo Missing
প্রকাশিত: 10:58:13 am, 2019-12-14 |  দেখা হয়েছে: 72 বার।

পাকিস্তান সরকারের শাষন শোষণ ও ধমন পীড়ণ যখন চরমে এমনি এক পরিস্থিতিতে ইডেন কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায়  প্রচন্ড  দ্রোহ নিয়ে মতিয়া চৌধুরীর আগমন ঘটে ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৬৫ সালে তৎ কালীন সর্ববৃহৎ ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী পেশ করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারাদেশে গনসংযোগ ও সফর শুরু করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যেগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য সমাবেশ আহ্বান করা হয়।  সেই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে  অগ্নিঝড়া বক্তব্য রাখেন মতিয়া চৌধূরী এবং বক্তব্যের মাঝে নিজেই শ্লোগান ধরেন ‘‘মুজিব ভাইয়ের কিছু হলে জ¦লবে আগুন ঘরে ঘরে” ‘‘অবিলম্বে মুজিব ভাইয়ের মুক্তি চাই দিতে হবে’’। তাঁর সেই গগন বিদারী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস। পরদিন থেকেই মতিয়া চৌধুরীকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগে। অনেকটা  ছদ্ম্যবেশে  কখনো কখনো আত্মগোপন করে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।১৯৬৭ সালের শুরুর দিকে  নেত্রকোনায় এক জনসভায় পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আইয়ূব সরকারের বিরুদ্ধে তেজদীপ্ত বক্তব্য রাখায় তাঁকে ‘অগ্নিকন্যা’ উপাধীতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৭ সালের জুন মাসের ৮ তারিখ তাঁকে  ‘দেশ রক্ষা’ আইনের ৩২ ধারা মোতাবেক গ্রেফতার করা হয়। বিনা বিচারে তাঁকে ৩ মাসের আটকাদেশ দেওয়া হলেও নির্বিচারে তাঁকে প্রায় ৩ বছর কারাভোগ করতে হয়।এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগর তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির জন্য দেশ ব্যাপি দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে। এই আন্দোলন গণ আন্দোলনে রুপ নেয় । চাপ কুলাতে না পেরে আইয়ূব খান ১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হবে বলে ঘোষনা করেন।বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তিনি বলেন ‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার সহ সকল রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। ১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং তাঁরা ১৪৪ ধারা কারফিউ ভঙ্গ করায় তাদের উপর পুলিশ, ইপিআর গুলি চালালে বহু লোক প্রাণ হারায়।ধারাবাহিক আন্দোলনে আসাদ, মতিউর, জহুরুল হক, ডঃ শামছুজ্জোহা  সহ অনেকের রক্তের বিনিময়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জনগনের অব্যাহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু সহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন। সেই দিনই অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী ও কমিউনিষ্ট নেতা কমরেড মনি সিং মুক্তি লাভ করেন এবং সকলেই মুক্তির মিছিলে শামিল হন।পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐতিহাসিক জনসভায়  শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধ’ু উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭০-১৯৭১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালান মতিয়া চৌধূরী । তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মহান মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আহত মুক্তি যোদ্ধাদের সেবা দানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবিস্বরণীয় হয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল বলেই ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্টের ইতিহাসের জঘন্যতম  হত্যাকান্ডের পর অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধূরী ও বর্তমান সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধূরী সর্ব প্রথম প্রতিবাদ করেন। ১৯৭৯ সালে আওয়ামীলীগে যোগদান করার পর আর পিছু ফিরতে হয়নি। সততা,নিষ্ঠা ও দলের প্রতি অঘাত ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে গিয়েছে সফলতার স্বর্ণ চূড়ায়। তিনি জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে বহুবার কারাভোগ করেছেন। দলের ক্রান্তিকালে বুক পেতে দলকে রক্ষা করেছেন বার বার, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘ওয়ান এলিভেন’। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন কারাগারে, তাঁর বিশ^স্তজনেরা যখন মীরজাফরের ভূমিকায় অবতীর্ণ তখন দলের দুঃসময়ে শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য রাজপথে অনঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের অধীকারী এই মহিয়সী নারী অতি সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। নির্মোহ, নির্লোভ এই মানুষটির পৃথিবীতে প্রিয়জন বলে কেউ নেই বলেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা  ও নিজ হাতে গড়া এই দেশটাই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। বিজয়ের এই মাসে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনাকারীদের অন্যতম কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধূরীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।  

সহকারী প্রধান শিক্ষক, তারাগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, নালিতাবাড়ী, শেরপুর।