ঢাকা   মঙ্গলবার ২৮ জানুয়ারী ২০২০ | ১৫ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Image Not Found!

ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্ক --- মুহাম্মদ মাসুদ কবির

Logo Missing
প্রকাশিত: 08:59:14 pm, 2019-11-22 |  দেখা হয়েছে: 35 বার।

একটি শিশু পিতা-মাতার হাত ধরেই পৃথিবীতে আসে, আলোর মুখ দেখে। পিতা-মাতাই শিশুটির জন্মদাতা, তবে বৈচিত্রময় পৃথিবী সম্পর্কে বুঝতে শেখে শিক্ষকের কাছে। শিক্ষকই জ্ঞান শূন্য মানব শিশুকে ভিন্ন চোখে বিশ^ দেখতে শেখায়, প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। মানুষের জ্ঞান চর্চার ঊষালগ্ন থেকেই ছাত্র-শিক্ষকের সর্ম্পকের সূচনা। বিদ্যাদান ও বিদ্যা গ্রহণের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে এই নিবিড় সম্পর্ক। শিক্ষক ছাত্রদের সামনে যে জ্ঞান প্রদীপ জ¦ালিয়ে দেন তারই আলোতে ছাত্র খুঁজে পায় জীবনের ঠিকানা। শিক্ষকের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আর ছাত্রের অপরিসীম শ্রদ্ধায় এই পরিত্র সম্পর্ক অনাবিল সৌন্দর্যে বিকাশিত হতে থাকে। নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক জ্ঞান দানের সাথে সাথে ছাত্রের জীবনের বিকাশ সাধন করার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বেরও জাগরণ ঘটিয়ে থাকেন। তাই পিতা-মাতারও একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল হওয়া আবশ্যক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রের শিক্ষকের কাছে লেখা পত্রে বলেছিলেন, “ আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে পাঠালাম। তকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন- এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।”

ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক আবহমান কাল ধরে চলছে। অতীতে শিষ্যরা গুরু গৃহে অবস্থান করে বিদ্যার্জনের পাঠ গ্রহণ করত এবং পাঠ শেষে গুরু দক্ষিনা দিয়ে নিজগৃহে ফিরে আসত। প্রাচীন ভারতে ও গ্রীসে ছাত্র শিক্ষকের এরূপ সম্পর্কের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। বর্তমানে বাউল ও সুফি সাধনায় গুরু শিষ্য সম্পর্কটি অত্যান্ত মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ককে পরস্পর নির্ভর ও সৌহার্দ মূলক সম্পর্ক হিসেবে বিচার করেছেন।

পিতা-মাতা সন্তানের সম্পর্কের মতো ছাত্র - শিক্ষকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য অনিন্দ্য সুন্দর সম্পর্ক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত অভিভাবকতুল্য ও বন্ধুসুলভ। শিক্ষক প্রথমে হবেন অভিভাবক তারপর বন্ধু। তবে সেই বন্ধুত্বের মধ্যে সীমারেখা থাকা উচিত। আসলে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া উচিত ‘ফ্রেন্ডলি’ , তবে ‘ফ্রেন্ড‘ নয়। ফলে অভিভাবক ও বন্ধুত্বের একটি মিশ্রণ থাকবে শিক্ষক আর ছাত্রের মঝে। অথচ আজ ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক অনেকটা তিক্ততায় পর্যবসিত। ছাত্র-শিক্ষকের সেই মধুর সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সময়ের পালা-বদলে মানুষের মন-মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার বহুমুখী বিপননে ব্যস্ত ছাত্র ও শিক্ষক। এরূপ বাজার ব্যবস্থায় কতিপয় শিক্ষক বিক্রেতা আর ছাত্র ক্রেতার ভূমিকায় নেমেছে। দামী দামী শিক্ষকের কাছে জ্ঞানার্জন করতে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের।
অন্যদিকে যাদের আর্থিক সঙ্গতি কম সে ধরনের অভিভাবকের সন্তানরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের কোচিং সেন্টার। এদের বাহারি বিজ্ঞাপনে শিক্ষকের প্রকৃত আদর্শ হারিয়ে কতিপয় ক্ষেত্রে শিক্ষক এখন মুনাফাখোর। বৈশি^ক চাহিদায় কিছু কিছু শিক্ষক নামধারী, বিবেকহীনের মতো পরীক্ষার হলে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর বলে দিচ্ছে এবং দিচ্ছে বাড়তি সুযোগ। অন্যদিকে কতিপয় ছাত্র শিক্ষককে কেনা গোলামের মতো ভাবছে। কখনও কখনও পরীক্ষার হলে সুযোগ সুবিধা না দিলে ছাত্রের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছে। রাজনীতির ছত্রছায়ায় কিছু ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী যেমন পবিত্র শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করছে তেমন পরম গুরুজন শিক্ষককে অপমান করতেও দ্বিধা করছে না। জাতির জীবনে এই অমানিশার ঘোর কাটতে আর কত দেরি ? ছাত্র জীবনের যথার্থ বিকাশের প্রয়োজনে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের এই ন্যক্কার জনক অধ্যায়ের সমাপ্তি এখনই ঘটাতে হবে। ছাত্র শিক্ষকের যৌথ আয়োজনে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চার পাদপীঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ছাত্র শিক্ষকের সু-সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষকের মধুর সম্পর্কের মধ্য দিয়েই নির্মিত হবে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। 

 

 

লেখকপ্রধান শিক্ষক,   

সমশ্চূড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

নালিতাবাড়ী, শেরপুর