ঢাকা   রবিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Image Not Found!

আধুনিক ও দ্বীনি শিক্ষার বাতিঘর নালিতাবাড়ীর গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসা

Logo Missing
প্রকাশিত: 09:58:33 am, 2019-09-03 |  দেখা হয়েছে: 59 বার।

নালিতাবাড়ী  : আধুনিক ও দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি দেশপ্রেমে উব্দুদ্ধ হয়ে শৃঙ্খলিত জীবন গঠনের বাতিঘর গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসা। প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি আদর্শের প্রতীক। ধর্মীয় অনুশাসন, দেশপ্রেম, পাঠাভ্যাস ও শৃঙ্খলিত জীবন গড়ার কারখানা যেন এ মাদরাসাটি।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ১৯৬২ সালের ১লা জানুয়ারি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান ইউনিয়নের গোজাকুড়া-কয়ারপাড় গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসা। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৭ সালের ১লা জানুয়ারি অনুমোদন লাভ এবং ১৯৭৯ সালের ১লা জানুয়ারি পাঠদানের স্বীকৃতি লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ১৯৮৫ সালের মার্চে এমপিওভুক্তি হয় গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসা।
অজপাড়াগায়ে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি স্থানীয়দের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করে গেলেও অভিভাবক ও ছেলে-মেয়েদের মানসিকতা, শিক্ষকদের দায়িত্বে অলসতা, স্থানীয়দের অসহযোগিতা আর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতায় প্রতিষ্ঠানটি নাম সর্র্বস্ব প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। অবকাঠামো আগে থেকেই দূর্বল হলেও সরকারের নজরদারি না থাকায় ধীরে ধীরে আরও নাজুক অবস্থা তৈরি হয়। কাগজে-কলমে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে ছিল এরকবারেই নগন্য। তবু এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি চলছিল ১১জন শিক্ষক নিয়ে। ১০১২ সালে এ প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে ১৮০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে ৩৫ জনকে। প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহ এ দূরাবস্থার মধ্যেই প্রদীপ হাতে নিয়ে সুপার হিসেবে হাজির হন মাওলানা আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন।
১১ জন শিক্ষক, ৩৫ জন শিক্ষার্থী ও ব্যবহার অনুপযোগী জরাজীর্ণ টিনসেড অবকাঠামো- সবমিলে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। নিজের টাকা খরচ করে গড়ে তোলেন সেমিপাকা ভবন। সময়মতো শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিতের পাশাপাশি পড়াশোনার মানোন্নয়নে কড়া নজরদারি ও পদক্ষেপ হাতে নেন তিনি। শাসন নয় বরং ভালোবাসার চাদরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আগলে রাখার চেষ্টা শুরু করেন শিক্ষার কারিগর এ মানুষটি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের বুঝিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে থাকেন প্রতিষ্ঠানে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রখর রোদেও যথাসময়ে সকলকে উপস্থিত থাকতে উদ্বুদ্ধ করায় মাত্র কিছুদিনেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসার। পাঠদানে আধুনিকায়ন, শৃঙ্খলাবোধ তৈরি ও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতায় উদ্যোমী হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই।
সম্প্রতি এ মাদরাসা পরিদর্শন করে শিক্ষার্থী সংখ্যা পাওয়া যায় ৬২২জন। যারমধ্যে বেশিরভাগই মেয়ে। এখানে মেয়ে শিক্ষার্থীর পরিমাণ ৪৭০ ও ছেলে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫২জন। শিক্ষকদের আন্তরিকতা-ভালোবাসা, নিয়মিত পাঠদান, অভিভাবকত্ববোধ- সবমিলে স্থানীয় অভিভাবকদের আস্থা কুড়াতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি। ফলে পেটের দায়ে অনেকের পিতা-মাতা দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করলেও উন্নত চরিত্র গঠন ও পড়ালেখার নিশ্চয়তা পেয়ে গ্রামের বাড়ি আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফেলে যান কন্যাদেরও। খোঁজ নিলে এমন অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যাদের শুধুমাত্র শিক্ষকদের উপর ভরসা করেই গ্রামে রেখে গেছেন অভিভাবকেরা।
শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে নিয়মিত পাঠদান ছাড়াও, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু, বিতর্কসহ নানা প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম, শৃঙ্খলাবোধ তৈরি এবং নৈতিকতাবোধ তৈরিতেও কাজ করেন শিক্ষকেরা। শ্রেণিকক্ষ মনিটরিং থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক দেখভাল করার জন্য সুপার নিজের টাকায় প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করেছেন। কখনও বা প্রতিষ্ঠানে রাত্রীযাপন করে দপ্তরী ও কমিটির সদস্যদের সাথে নিয়ে রাতের বেলায় শিক্ষার্থীদের হোম ভিজিটও করে থাকেন সুপার জামাল উদ্দিন। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য সন্ধ্যা এমনকি রাত নয়টা অবধি অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করেছেন সুপার। ইতিমধ্যেই শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী ও শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধানের স্বীকৃতিও মিলেছে। তাই সকলের কাছে তিনি শুধু একজন সুপারই নন, একজন অভিভাবকও বটে। যার কাছে ভরসা শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকদেরও।
মাদরাসার সহকারী শিক্ষক আব্দুস সালাম জানান, ২০১২ সালে সুপার জামাল সাহেব যোগদানের পর তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উৎসাহ দিয়েছেন, আমাদের প্রেরণা দিয়েছেন। যার ফলে আগে মাদরাসায় এলে আমরা দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। আর এখন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থাকলেও আমাদের যেতে ইচ্ছে করে না।
সাবেক ইউপি সদস্য ও বর্তমানে অভিভাবক ওয়াহেদ আলী মেম্বার জানান, ২০১২ সালের আগে কি যে অবস্থা ছিল, এই মাদরাসায় কোন ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী পাইছি কোন ক্লাসে পাইনি। এই মাদরাসা ভেঙ্গে পড়ে গিয়েছিল। তারপর সুপার সাহেব এসে নিজের টাকা খরচ করে যে সহযোগিতা করেছেন- এমন ধরণের মানুষ আর মিলবে কি না জানি না।
সহকারী শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, আমাদের সাবেক সুপার অসুস্থ হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছাত্রছাত্রী কমে যায়, শিক্ষক ছিল না পাঁচজন। তাঁর মৃত্যুর পর বর্তমান সুপার জামাল সাহেব যোগদান করেন। এরপর এলাকাবাসী, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক সকলকে একত্রিত করে পর্যায়ক্রমে এ মাদরাসাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
অভিভাবক হযরত আলী জানান, সুপার প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্ররা লেখাপড়া করছে কি না তা দেখাশোনা করছেন, এ জন্য আমরা সন্তুষ্ট। আমাদের সন্তানেরা দেশ গড়ায় কাজে লাগবে- এ কথা আমাদের বিশ্বাস হয়। বিভিন্ন সময় সুপার প্রতিষ্ঠানে ডেকে এনে আমাদের নিয়ে পরামর্শ করেন এবং সভা-সমাবেশ করেন, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান অভিভাবক সদস্য বাদশা মিয়া জানান, বর্তমানে মাদরাসার যে পরিবেশ হয়েছে তাতে আমরা এ সুপারের প্রতি কৃতজ্ঞ। তার নিজের চেষ্টায় এবং আমাদের সহযোগিতায় এ মাদরাসা আজ এগিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, বাল্যবিয়ে যাতে না হয় এ জন্য মাদরাসায় আমাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনেক ছাত্রছাত্রী টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারে না, আমাদের সুপার হুজুর নিজের টাকায় তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যান। যাতে করে তারা ঝড়ে না পড়ে।
তারা জানায়, বিভিন্ন সময় নানা প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে আমরা শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব অর্জন করেছি। শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব অর্জন করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও।
তারা আরও জানায়, ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা কিংবা প্রচন্ড রোদেও শিক্ষক ও আমাদের উপস্থিতি থাকে প্রচুর। ফলে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় আমরা শতভাগ পাশ করে থাকি।
শিক্ষার্থীরা জানায়, আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে আমাদের ক্লাস পরিচালিত হয়। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নেওয়ার ফলে আমরা সহজে বুঝতে পারি। আমাদের এবং শিক্ষকদের মাঝে পিতা-মাতা ও সন্তানতুল্য স্নেহ-ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। যার ফলে আমরা একে অপরকে ভালোভাবে বুঝতে পারি।
সুপার মাওলানা জামাল উদ্দিন বলেন, আমি মাদরাসায় যোগদান করি ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। তখন এসে ছাত্রছাত্রী পাই ৩০-৩৫ জন। দশটি শ্রেণিকক্ষও ছিল না। জড়াজীর্ণ ক্লাসরুম দেখে অনেকটা হতাশই হয়েছিলাম। তখন ভাবলাম, আমি যদি এটি এভাবে ফেলে চলে যাই তবে হয়ত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে। সুতরাং এ মাদরাসাটিকে যদি দাড় করিয়ে যেতে পারি, একটা ভালো পর্যায়ে নিতে পারি, তবে এটি ইবাদতের শামিল হবে। তিনি বলেন, এটি একটি গরীব ও পিছিয়ে পড়া এলাকা। তাই সবসময় চেষ্টা করি শহরের উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে আধুনিকতার ছোয়ায় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয় তার চেয়ে কোন অংশেই যেন আমাদের এ মাদরাসাটি পিছিয়ে না থাকে। এর ফলে আমাদের ফলাফলও প্রায় শতভাগ।
তবে সুপার ও অন্যান্য শিক্ষকরা দুঃখ প্রকাশ বলেন, সরকারীভাবে কোন একাডেমিক ভবন এখনও মাদরাসায় দেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের জায়গা সংকুলান হয় না। নেই কোন হলরুম।
মাদরাসা পরিদর্শন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, গোজাকুড়া দাখিল মাদরাসাটি উপজেলার অন্যতম একটি প্রধান মাদরাসা। বারবরই এর ফলাফল খুবই ভাল এবং প্রথম স্থান অধিকার করে। এ মাদরাসার পাঠদান সম্পূর্ণই ভিন্ন। বিশেষ করে, এর সুপার মালানা জামাল সাহেবের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ মাদরাসাটি অত্যন্ত ভালো করেই চলেছে। এসময় তিনি মাদরাসার অবকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র পাঠিয়েছেন বলেও জানান।